- মানত হচ্ছে শরীয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজের উপর কোনো কিছু আবশ্যক করা, হোক সেটি (তৎক্ষণাৎ) কার্যকর কিংবা (কিছুর সাথে) শর্তযুক্ত।
- শরীয়তসম্মত মানত পূরণ করা ওয়াজিব। কারণ আল্লাহ বলেছেন: “এরপর তারা যেন নিজেদের ময়লাগুলো দূর করে এবং মানতগুলো পূরণ করে।”[সূরা হজ্জ, আয়াত: ২৯]
- মানতের প্রকারসমূহ: ১. যে মানত পূরণ করা ওয়াজিব। এটি হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্যমূলক মানত। ২. যে মানত পূরণ করা জায়েয নেই এবং যাতে শপথের কাফ্ফারা রয়েছে। এতে অন্তর্ভুক্ত হয়: আল্লাহর অবাধ্যতার মানত, শরিয়তের সুস্পষ্ট বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক প্রত্যেক মানত, শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা ছাড়া আর কোনো হুকুম নেই এমন মানত এবং যে মানত পূরণ করা ও শপথের কাফ্ফারা দেওয়ার মাঝে যে কোনো একটি বাছাই করার সুযোগ রয়েছে।
মানতের প্রকারভেদ ও বিধি-বিধানের সারসংক্ষেপ
প্রশ্ন 2587
শরীয়তে মানতের বিধান কী?
উত্তরের সার-সংক্ষেপ
উত্তর
বিষয়সূচী
প্রশ্নকারী বোন, আপনার জন্য নিম্নে মানতের বিষয়ে বিবরণ প্রদান করা হলো। এতে রয়েছে মানতের প্রকারভেদ ও মৌলিক বিধি-বিধান। ইন শা আল্লাহ এটি আপনার ও অন্যান্য পাঠকদের উপকার করবে।
মানত কী?
আসফাহানী রাহিমাহুল্লাহ ‘মুফরাদাতু আলফাযিল কুরআন’ গ্রন্থে (পৃ. ৭৯৭) বলেন: মানত হচ্ছে— কোনো কিছু ঘটার সাথে আপনি নিজের উপর এমন কিছু করা আবশ্যক করে নেয়া; যা আবশ্যক নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَنِ صَوْمًا
“আমি আর-রহমানের (আল্লাহর) জন্য রোযা মানত করেছি।”[সূরা মারইয়াম: ২৬][সমাপ্ত]
মানত হচ্ছে শরীয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজের উপর কোনো কিছু আবশ্যক করা, হোক সেটি (তৎক্ষণাৎ) কার্যকর কিংবা (কিছুর সাথে) শর্তযুক্ত। আল্লাহর কিতাবে মানতকে প্রশংসার স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের ব্যাপারে বলেন:
إِنَّ الْأَبْرَارَ يَشْرَبُونَ مِن كَأْسٍ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُورًا عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفْجِيرًا يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا
“সৎকর্মশীলরা এমন এক পেয়ালা থেকে পান করবে (যার শরাবে) কাফূরের মিশ্রণ থাকবে। এমন একটি ঝরনা যা থেকে আল্লাহর বান্দারা পান করবে এবং তারাই একে যথাযথভাবে (নিজেদের সুবিধামত) প্রবাহিত করবে। তারা (তাদের) মানত পূরণ করে (কর্তব্য পালন করে) এবং এমন একটি দিনকে ভয় করে যার অনিষ্ট হবে ব্যাপক।”[সূরা দাহর: ৫-৭]
কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতার ব্যাপারে তাদের শঙ্কা এবং মানত পূরণ করাকে আল্লাহ তাআলা তাদের নাজাত লাভ ও জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করেছেন।
মানতের বিধান
শরীয়তসম্মত মানত পূরণ করা ওয়াজিব। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন:
ثُمَّ لْيَقْضُوا تَفَثَهُمْ وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ
“তারপর তারা যেন তাদের ময়লাগুলো দূর করে এবং মানতগুলো পূরণ করে।”[সূরা হজ্জ: ২৯]
ইমাম শাওকানী বলেন: নির্দেশ ওয়াজিব সাব্যস্ত করে।
মানত মাকরুহ হওয়া প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস
মানত করা থেকে নিষেধ করা ও মানত মাকরুহ হওয়া প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বেশ কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “তোমরা মানত করো না। কারণ মানত তাকদীরের বিপরীতে কোনো কাজে আসে না। বরং এর দ্বারা কৃপণ থেকে কিছু সম্পদ বের করা হয়।”[সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৩০৯৬]
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে মানত করতে নিষেধ করে বলেন: “এটি (ভাগ্যে থাকা) কোনো কিছুকে প্রতিহত করে না। বরং এর দ্বারা কৃপণ থেকে কিছু বের করা হয়।”[হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেন]
প্রশংসনীয় ও নিষিদ্ধ মানতের মধ্যকার পার্থক্য:
কেউ যদি বলে: মানত পূরণকারীদের প্রশংসা করার পর আবার কীভাবে তা করতে নিষেধ করা হয়? তাহলে এর উত্তর হলো: প্রশংসনীয় মানত হচ্ছে কোনো কিছুর সাথে শর্তযুক্ত না করে নিছক আনুগত্যমূলক মানত। মানুষ নিজেকে আনুগত্যমূলক কাজে বাধ্য করতে এবং অলসতা থেকে নিবৃত করতে কিংবা নিয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে এ ধরনের মানত করে থাকে।
অন্যদিকে নিষিদ্ধ মানত কয়েক প্রকার। তন্মধ্যে রয়েছে: কোনো কিছুর বিনিময়মূলক মানত, যেখানে মানতকারী আনুগত্যকে কোনো কিছু প্রাপ্তি কিংবা প্রতিহত করার সাথে শর্তযুক্ত করে রাখে; ফলে সে ঐ বস্তু না পেলে সে আনুগত্যমূলক কাজটি করে না। এ ধরনের মানতের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য।
সম্ভবতঃ এই নিষেধাজ্ঞায় নিহিত প্রজ্ঞা নিম্নরূপ:
- মানতকারী অনীহা নিয়ে মানত পূরণ করে; যেহেতু এটি হঠাৎ করে তার উপর আবশ্যক হয়ে গিয়েছে।
- মানতকারী যখন কোনো কিছু প্রাপ্তির শর্তে (আল্লাহর) নৈকট্যমূলক কাজ করার মানত করেছে, তখন তার এই মানত হয়ে পড়েছে বিনিময়; যা নৈকট্য অর্জনকারীর নিয়তে সমস্যা সৃষ্টি করে। যেমন: তার রোগী সুস্থ না হলে সুস্থতার সাথে সে যে পরিমাণ দান করাকে শর্তযুক্ত করেছিল সেটি সে করবে না। আর এটি কৃপণ ব্যক্তির অবস্থা। এই ব্যক্তি তাৎক্ষণিক বিনিময় ছাড়া নিজের সম্পদ থেকে কিছু দেয় না। সাধারণত সে যে পরিমাণ নিজ সম্পদ থেকে দান করে থাকে, তার থেকে অতিরিক্ত পরিমাণ কেবল সে এই বিনিময়ের কারণেই প্রদান করে থাকে।
- কিছু মানুষের এ ধরনের জাহেলী বিশ্বাস আছে যে, সে যে উদ্দেশ্যে মানত করেছিল সেটি মানত করার কারণেই পূরণ হবে অথবা আল্লাহ মানতকারীকে তার মানতের জন্য উদ্দেশ্য পূরণ করে দিবেন।
- কিছু অজ্ঞ ব্যক্তির মনে থাকা এক ধরনের বিশ্বাস নাকচ করা। সে বিশ্বাসটি হচ্ছে: মানত তাকদীরকে প্রতিহত করে অথবা তার জন্য তৎক্ষণাৎ ভালো কিছু নিয়ে আসে অথবা মন্দ কিছু দূর করে দেয়। অজ্ঞ ব্যক্তির এমন বিশ্বাসের আশঙ্কায় মানতকে নিষেধ করা হয়েছে। পাশাপাশি এ ধরনের বিশ্বাস আকীদার বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে কতটা ভয়াবহ সেটির দিকে সতর্ক করাও এর উদ্দেশ্য।
পূরণ করা ওয়াজিব হওয়ার বিবেচনা থেকে মানতের প্রকারভেদ:
১. যে মানত পূরণ করা আবশ্যক (আনুগত্যের মানত): যে মানত আল্লাহর আনুগত্যে হয়ে থাকে। যেমন: নামায, রোযা, উমরা, হজ্জ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, ইতিকাফ, জিহাদ, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ। যেমন: যদি সে বলে, আমার উপর আল্লাহর জন্য এই পরিমাণ রোযা রাখা বা এই পরিমাণ দান করা আবশ্যক। কিংবা যদি সে বলে, আমার উপর আল্লাহর জন্য এই বছর হজ্জ করা আবশ্যক অথবা আল্লাহ আমার রোগীকে সুস্থ করার যে নিয়ামত দিয়েছেন তার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এ বছর মসজিদে হারামে দুই রাকাত নামায পড়া আমার উপর আবশ্যক। অথবা শর্তযুক্ত মানত; যেমন: কেউ যদি আল্লাহর নৈকট্যমূলক কোনো নেকীর কাজ করার মানত করে, তবে সেটা কোনো উপকারপ্রাপ্তির সাথে শর্তযুক্ত করে; যদি উপকারটি লাভ হয় সে নেকীর কাজটি করবে। উদাহরণস্বরূপ কেউ এভাবে বলা: যদি আমার হারানো ব্যক্তি ফিরে আসে অথবা যদি আল্লাহ আমাকে আমার শত্রুর অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন তাহলে এতটি রোজা রাখা বা এ পরিমাণ সদকা করা আমার উপর আবশ্যক।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “কেউ যদি মানত করে যে সে আল্লাহর আনুগত্য করবে, সে যেন তার আনুগত্য করে। আর কেউ যদি মানত করে যে তার অবাধ্যতা করবে, সে যেন তার অবাধ্যতা না করে।”[হাদীসটি বুখারী (৬২০২) বর্ণনা করেন]
কেউ যদি আল্লাহর আনুগত্যমূলক কোনো মানত করে, তারপর এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় যা তার মানত পূরণে প্রতিবন্ধক হয়; যেমন: সে যদি এক মাস রোযা রাখা অথবা হজ্জ করা অথবা উমরা করার মানত করে কিন্তু কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে রোযা রাখা, হজ্জ করা অথবা উমরা করতে অক্ষম হয় কিংবা দান করার মানত করে, কিন্তু দরিদ্র হয়ে যায় ফলে মানত পূরণ করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে, তাহলে সে মানতের কাফ্ফারা হিসেবে শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা দিবে। যেমনটি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “কেউ যদি এমন কোনো মানত করে যা পূরণ করতে সে সক্ষম নয়, তাহলে এর কাফফারা হলো শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা।”[হাদীসটি আবু দাউদ বর্ণনা করেন। হাফেয ইবনে হাজার বুলুগুল মারাম গ্রন্থে বলেন: হাদীসটির সনদ সহীহ। হাদীসের হাফেযরা বর্ণনাটি মাওকূফ (সাহাবী থেকে বর্ণিত) হওয়ার মতটি প্রাধান্য দিয়েছেন]
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ ‘আল-ফাতাওয়া’ (৩৩/৪৯) গ্রন্থে বলেন: ‘কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর কোনো আনুগত্য করার মানত করে তাহলে তার উচিত এই মানত পূরণ করা। কিন্তু, যদি আল্লাহর জন্য কৃত মানত পূরণ না করে তাহলে অধিকাংশ সালাফের মতে সে শপথভঙ্গের কাফ্ফারা দিবে।’[আল-ফাতাওয়া (৩৩/৪৯)]
২. যে মানত পূরণ করা জায়েয নেই, আর এতে রয়েছে শপথভঙ্গের কাফ্ফারা। এ প্রকার মানতে অন্তর্ভুক্ত হবে:
পাপের মানত: এটি এমন সব মানত যা আল্লাহর অবাধ্যতার অন্তর্ভুক্ত। যেমন: কবর বা মাজারে তেল, মোমবাতি বা খরচ দেওয়ার মানত করা, শির্কপূর্ণ কবর বা মাজার যিয়ারতের মানত করা। এটি কিছু দিক থেকে মূর্তির উদ্দেশ্যে মানত করার অনুরূপ। তদ্রূপ কেউ যদি কোনো গুনাহ করার মানত করে, যেমন: ব্যভিচার করা, মদ পান করা, চুরি করা, এতিমের সম্পদ ভক্ষণ করা, কারও হক অস্বীকার করা কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা (যেমন: কোনো শরয়ি কারণ ছাড়াই নির্দিষ্ট কোনো আত্মীয়ের সাথে কথা না বলা বা তার বাড়িতে প্রবেশ না করা)। এ সব মানত কোনো অবস্থাতেই পূরণ করা বৈধ নয়। বরং এর জন্য শপথের কাফফারা আদায় করতে হবে।
এ ধরনের মানত পূরণ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রমাণ হলো: আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীস, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে আল্লাহর আনুগত্য করার মানত করে সে যেন তা পালন করে। আর যে আল্লাহর অবাধ্যতা করার মানত করে সে যেন তা না করে।”[হাদীসটি বুখারী বর্ণনা করেন]
ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “গুনাহের কাজে কোনো মানত পূরণ নেই।”[হাদীসটি মুসলিম (৩০৯৯) বর্ণনা করেন]
প্রত্যেক যে মানত শরঈ দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক: কোনো মুসলিম যদি মানত করে এবং পরে তার কাছে স্পষ্ট হয় যে তার মানতটি কোনো শরয়ি সহীহ ও স্পষ্ট দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক, তখন তার জন্য মানত পূরণ থেকে বিরত থাকা ও শপথের কাফফারা আদায় করা অনিবার্য।
এর পক্ষে দলীল হচ্ছে, বুখারীতে বর্ণিত হাদীস: যিয়াদ ইবনে জুবাইর বলেন: আমি ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে ছিলাম। এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করে বলল: ‘আমি সারা জীবন প্রতি মঙ্গলবার বা বুধবার রোযা রাখার মানত করেছি। আজকের দিনটি কুরবানির দিন পড়ে গেছে।’ তিনি বললেন: ‘আল্লাহ মানত পূরণের আদেশ দিয়েছেন এবং আমাদেরকে কুরবানির দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।’ লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, তিনি একই উত্তর দিলেন। অতিরিক্ত কিছু বললেন না।[বুখারী (৬২১২) হাদীসটি বর্ণনা করেন]
ইমাম আহমদ বর্ণনা করেন, যিয়াদ ইবনে জুবাইর বর্ণনা করেন: ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মিনায় হেঁটে যাচ্ছিলেন এর মধ্যে এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করল: ‘আমি সারা জীবন প্রতি মঙ্গলবার বা বুধবার রোযা রাখার মানত করেছি। আজকের এই দিনটি কুরবানির দিনে পড়ে গেছে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?’ তিনি বললেন: ‘আল্লাহ মানত পূরণের আদেশ দিয়েছেন, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন কিংবা (বলেছেন) আমাদেরকে কুরবানির দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।’ লোকটি মনে করল যে তিনি প্রশ্নটি শোনেননি। সে আবার জিজ্ঞেস করল: ‘আমি সারা জীবন প্রতি মঙ্গলবার বা বুধবার রোযা রাখার মানত করেছি। আজকের এই দিনটি কুরবানির দিনে পড়ে গেছে। তখন তিনি বললেন: ‘আল্লাহ মানত পূরণ করার আদেশ দিয়েছেন, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন কিংবা (বলেছেন) আমাদেরকে কুরবানির দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।’ পাহাড়ে ওঠার আগ পর্যন্ত তিনি অতিরিক্ত কিছু বলেননি।
হাফেয ইবনে হাজার বলেন: ‘এ বিষয়ে ইজমা (সর্বসম্মত মত) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে নফল কিংবা মানত কোনো প্রকার রোযা রাখাই বৈধ নয়।’
যে মানতের বিধান শপথের কাফফারা ছাড়া অন্য কিছু নয়: কিছু মানত আছে যেগুলোর ক্ষেত্রে মানতকারীর উপর কেবল শপথের কাফফারাই ওয়াজিব হয়। এমন মানতের মধ্যে রয়েছে:
উন্মুক্ত মানত (যে মানতে মানতকৃত বিষয় উল্লেখ করা হয়নি): কোন মুসলিম যদি মানত করে, কিন্তু কী মানত করেছে তা উল্লেখ না করে বা নির্দিষ্ট না করে উন্মুক্ত রেখে দেয়; যেমন এভাবে বলা: আল্লাহ যদি আমার রোগ সারিয়ে দেন তাহলে আমার উপর আল্লাহর জন্য একটি মানত আবশ্যক, কিন্তু কোনো কিছু নির্দিষ্ট না করে, তাহলে তার উপর শপথের কাফফারা ওয়াজিব হবে।
উকবা ইবনে আমির রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “মানতের কাফফারা হলো শপথের কাফফারা।”[হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেন] ইমাম নববী বলেন: মালেক ও অধিকাংশ আলেম এটিকে উন্মুক্ত মানতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলেছেন; যেমন: কেউ বলল: আমার উপর একটি মানত আবশ্যক।[শরহে মুসলিম: (১১/১০৪)]
যে মানতে মানত পূরণ করা বা কাফফারা দেয়া, এ দু’টোর মধ্যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে:
কিছু মানত আছে যেগুলো পূরণ করা কিংবা শপথের কাফ্ফারা দেওয়া উভয়টির মাঝে যে কোনো একটি বাছাইয়ের সুযোগ আছে। এ ধরনের মানতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:
১. জিদ বা রাগের মানত: এটি এমন প্রত্যেক মানত যা শপথের মতো কোনো কাজ করতে উৎসাহ দিতে বা বাধা দিতে, সত্যায়ন করতে বা অস্বীকার করতে করা হয়। মানতকারী মানতকে উদ্দেশ্য করে না বা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনকে উদ্দেশ্যে করে না। যেমন: রাগের সময় কেউ এভাবে বলা: ‘আমি যদি এটা করি তবে আমার ওপর হজ করা আবশ্যক’ বা ‘এক মাস রোযা রাখা আবশ্যক’ বা ‘এক হাজার দিনার সদকা করা আবশ্যক’ অথবা যদি বলে: ‘আমি যদি অমুকের সাথে কথা বলি তবে আমার এই দাসকে মুক্ত’ বা ‘আমার স্ত্রী তালাক’ ইত্যাদি। এরপর সে কাজটি করে ফেলে। অথচ এ কথাগুলো বলার পিছনে তার উদ্দেশ্য ছিল কেবল কাজটি না করার ব্যাপারে দৃঢ়তা প্রকাশ করা; অন্যকিছু নয়। তার প্রকৃত উদ্দেশ্য শর্তকৃত কাজটি না করা এবং ফলাফলও কার্যকর না করা। এ ধরনের মানতে মানতকারীকে দুইটির কোনো একটি করার অবকাশ দেওয়া হয়: (মানত পূরণ করা কিংবা শপথের কাফফারা আদায় করা)।
২. যে মানতের অবস্থা হচ্ছে তর্ক-বিতর্ক কিংবা যে মানতের উদ্দেশ্য কোনো কিছু করা বা না করার প্রতি উৎসাহ প্রকাশ করা (মানত পূরণ করা কিংবা মানতের বদলে শপথের কাফ্ফারা দেওয়া; বিষয়টিকে মূলতঃ মানত হিসেবে গণ্য করে)। ইবনে তাইমিয়া বলেন: ‘যদি মানতকে শপথের মত করে শর্তযুক্ত করে; যেমন এভাবে বলল: ‘আমি যদি তোমাদের সাথে সফর করি তাহলে আমার ওপর হজ করা অনিবার্য’ বা ‘আমার সম্পদ সদকা’ বা ‘দাস মুক্ত’, তবে এটি সাহাবায়ে কেরাম ও জমহুর আলেমের মতে মানতের শপথ; মানত নয়। তাই সে নিজের উপর যা অনিবার্য করেছে সেটা যদি পূরণ না করে; তবে শপথের কাফফারা দেয়াই যথেষ্ট।” তিনি অন্য স্থানে বলেন: “আমাদের মতে জিদ ও রাগের মানতের ক্ষেত্রে দুটো বিষয়ের কোনটি করতে পারবে: কাফফারা দেওয়া কিংবা শর্তযুক্ত কাজটি করা। যদি সে শর্তযুক্ত অনিবার্যকৃত কাজটি না করে, তাহলে কাফফারা ওয়াজিব হবে।”
৩. বৈধ বিষয়ে মানত করা: এটি এমন মানত যা বৈধ কাজের সাথে সম্পর্কিত। যেমন নির্দিষ্ট পোশাক পরা, নির্দিষ্ট খাবার খাওয়া, নির্দিষ্ট বাহনে চড়া, নির্দিষ্ট ঘরে প্রবেশ করা ইত্যাদি।
সাবিত ইবনে দাহহাক থেকে বর্ণিত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এক ব্যক্তি বুওয়ানাহ নামক স্থানে উট জবাই করার মানত করেছিল (এক বর্ণনায় আছে: তার পুত্র সন্তান জন্মানোর কারণে)। তখন সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল: ‘আমি বুওয়ানাহতে উট জবাই করার মানত করেছি।’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন: “সেখানে কি জাহেলিয়াতের কোনো মূর্তি পূজিত হতো?” তারা বলল: ‘না।’ তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন: “সেখানে কি তাদের কোনো উৎসব হতো?” তারা বলল: ‘না।’ তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “তোমার মানত পূরণ করো; কারণ আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কোনো মানত পূরণ করা যায় না এবং এমন কোনো মানত পূরণ করা যায় না যা আদম সন্তানের মালিকানায় নেই।”[হাদীসটি আবু দাউদ (২৮৮১) বর্ণনা করেন]
এই ব্যক্তি পুত্র সন্তান লাভের কারণে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করে (ইয়াম্বুর পেছনে) বুওয়ানাহ নামক স্থানে উট জবাই করার মানত করেছিল। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সেখানে মানত পূরণের অনুমতি দিয়েছিলেন।
আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর পছন্দনীয় ও সন্তোষজনক কাজ করার তৌফিক দান করেন। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
সূত্র:
ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব