শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
হে মুসলিম, জেনে রাখুন। মহান আল্লাহ সকল বান্দার জন্য ইসলামে প্রবেশ করা ও ইসলামকে আঁকড়ে ধরা আবশ্যক করেছেন। আর ইসলামের বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু করা থেকে সতর্ক করেছেন। তিনি তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেয়ার জন্য প্রেরণ করেছেন। মহান আল্লাহ জানিয়েছেন, যে তার অনুসরণ করল, সে সুপথ পেল। আর যে তার থেকে বিমুখ হল, সে বিভ্রান্ত হল। বহু আয়াতে তিনি ধর্মত্যাগের কারণগুলোর পাশাপাশি শিরক-কুফরের বিভিন্ন প্রকার থেকে সতর্ক করেছেন। আলেমরা মুরতাদের হুকুম সংক্রান্ত অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন যে, মুসলিম ব্যক্তি বেশ কিছু ঈমান ভঙ্গকারী বিষয়ের মাধ্যমে দ্বীন-ত্যাগী বলে গণ্য হবে, যেগুলোর কারণে তার রক্ত ও সম্পদ হালাল হয়ে যাবে এবং সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও সবচেয়ে বেশি ঘটে এমন দশটি উল্লেখ করেছেন শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহ্হাবসহ অন্যান্য আলেমরা। আল্লাহ তাদের সবাইকে রহম করুন। আমি তার মাঝে সংক্ষেপে কিছু আপনার কাছে উল্লেখ করছি, যেন আপনি সেগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে পারেন এবং অন্যদেরকেও সেগুলো থেকে সতর্ক করতে পারেন; এ আশায় যে এর থেকে নিরাপদ ও সুস্থ থাকা সম্ভব হবে। প্রতিটির সাথে সামান্য কিছু বিবরণ আমরা সেগুলোর পরে উল্লেখ করছি:
এক:
মহান আল্লাহর ইবাদতে শিরক। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করেন না; আর তার থেকে ছোট যাবতীয় গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিবেন, আর যে কেউ আল্লাহ্র সাথে শিরক করে সে ভীষণভাবে পথ ভ্রষ্ট হয়।” (সূরা নিসা: ১১৬)। তিনি আরো বলেন: “নিশ্চয় কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর অন্যায়কারীদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” (সূরা মায়েদা: ৭২)। এর অন্তর্ভুক্ত বিষয় হলো: মৃত ব্যক্তিদের কাছে চাওয়া, তাদের সাহায্য প্রার্থনা করা ও তাদের জন্য যবাই করা। যেমন: কেউ যদি জীনের জন্য বা কবরের জন্য যবাই করে।
দুই:
যে ব্যক্তি তার ও আল্লাহর মাঝে এমন কিছু মাধ্যম গ্রহণ করে, যাদের কাছে সে প্রার্থনা করে, সুপারিশ চায় এবং তাদের উপর ভরসা করে, সে সর্বসম্মতিক্রমে কাফের হয়ে যাবে।
তিন:
যে ব্যক্তি মুশরিকদেরকে কাফির মনে না করে অথবা তাদের কুফরীর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে অথবা তাদের মতাদর্শকে সঠিক মনে করে, সে কাফের হয়ে যাবে।
চার:
যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের চেয়ে অন্য আদর্শ অধিক পরিপূর্ণ অথবা তাঁর বিধানের চেয়ে অন্য কারো বিধান বেশি ভালো, যেমন: যে ব্যক্তি তাঁর বিধানের উপর তাগুতের বিধানকে প্রাধান্য দেয়; তাহলে সে কাফের।
পাঁচ:
যে ব্যক্তি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন এর কোনো কিছুকে ঘৃণা করে, তাহলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে, যদিও সে ঐ বিষয়ের উপর আমল করে। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেন: “এটা এ জন্য যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তারা তা অপছন্দ করেছে। কাজেই তিনি তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন।” (সূরা মুহাম্মাদ: ৯)।
ছয়:
যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধর্মের কোনো কিছু কিংবা ধর্মীয় নেকী কিংবা শাস্তিকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে, সে কাফির হয়ে যাবে। এর দলীল আল্লাহর বাণী: “আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা করছিলে? তোমরা ওজর পেশ করো না, তোমরা ঈমান আনার পর কাফের হয়ে গেছ।” (সূরা তাওবাহ: ৬৫ ও ৬৬)।
সাত:
জাদু। এর মধ্যে রয়েছে- বিদ্বেষন ও বশীকরণ জাদু। যে ব্যক্তি জাদু করবে কিংবা এ কাজের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে, সে কাফের হয়ে যাবে। এর দলীল হলো আল্লাহর বাণী: “তারা উভয়েই এই কথা না বলে কাউকে (জাদু) শিক্ষা দিত না যে, ‘আমরা নিছক একটি পরীক্ষা; কাজেই তুমি কুফরী করো না’।” (সূরা বাকারা: ১০২)।
আট:
মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুশরিকদেরকে সাহায্য করা। এর দলীল আল্লাহর বাণী: “আর তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে মিত্র হিসেবে গ্রহন করলে সে নিশ্চয় তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হেদায়াত দেন না।” (সূরা মায়েদা: ৫১)।
নয়:
যে ব্যক্তি মনে করে, কিছু মানুষের জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়তের বাহিরে যাওয়ার সুযোগ আছে যেমনিভাবে খিজির মুসা আলাইহিস সালামের শরীয়তের বাহিরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন; সে কাফের। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা আলে-ইমরান: ৮৫)।
দশ:
আল্লাহর দ্বীন থেকে বিমুখ হওয়া, দ্বীন না-শেখা এবং দ্বীন অনুযায়ী আমল না করা। এর দলীল আল্লাহর বাণী: “যে ব্যক্তি তার রবের আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশপ্ৰাপ্ত হয়ে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে বড় যালিম আর কে? নিশ্চয় আমরা অপরাধীদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী।” (সূরা সাজদা: ২২)।
ঈমান ভঙ্গকারী এই সকল বিষয় মজাচ্ছলে করা, স্বাভাবিকভাবে করা কিংবা ভীত অবস্থায় করার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। এগুলো সবই খুবই ভয়াবহ এবং সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ঘটে থাকে। একজন মুসলিমের উচিত এগুলো থেকে সতর্ক থাকা এবং নিজের ক্ষেত্রে এগুলোর আশঙ্কা করা। আমরা আল্লাহর কাছে এমন কিছু থেকে আশ্রয় চাই, যা তার ক্রোধ ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিকে অনিবার্য করে দেয়। আর দরূদ ও সালাম তার সর্বোত্তম সৃষ্টি মুহাম্মাদ, তার পরিবার ও সাথীদের উপর। [তার কথা সমাপ্ত]।
চতুর্থ প্রকারে অন্তর্ভুক্ত হবে:
এমন ব্যক্তি যে মনে করে মানুষের প্রণীত আইন-কানুন ইসলামী শরীয়তের চেয়ে উত্তম কিংবা ইসলামী আইনের সমান কিংবা শরীয়ত অনুযায়ী বিচার করা উত্তম মনে করলেও মানবরচিত আইনে বিচার চাওয়াকে বৈধ মনে করে কিংবা ইসলামী আইন বিংশ শতাব্দীতে প্রয়োগ করার উপযোগী নয় মনে করে কিংবা এটা মুসলিমদের পশ্চাৎপদতার কারণ বলে গণ্য করে কিংবা ইসলাম ব্যক্তির সাথে তার রবের সম্পর্কে সীমিত, জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে ইসলাম হস্তক্ষেপ করে না এমনটা ভাবে।
চতুর্থ প্রকারে আরো অন্তর্ভুক্ত হবে:
এমন ব্যক্তি যে মনে করে চোরের হাত কাটা কিংবা বিবাহিত ব্যভিচারীকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করা বর্তমান যুগের জন্য অনুপযোগী।
এই প্রকারে আরো অন্তর্ভুক্ত হবে: প্রত্যেক এমন ব্যক্তি যে মনে করে আল্লাহর শরীয়ত ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে লেনদেন, দণ্ডবিধি বা এই দুটি ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে বিচার করা যাবে, যদিও সে বিশ্বাস না করে যে সেটা শরীয়তের বিধানের চেয়ে উত্তম। কারণ এ অবস্থায় সে এমন কিছুকে বৈধ বলে দিল, যা আল্লাহ হারাম করার ব্যাপারে সবাই একমত। আর আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তন্মধ্যে যেগুলো দ্বীনের আবশ্যকীয় জ্ঞাত বিষয়, সেগুলোর বৈধতা কেউ যদি প্রদান করে; যেমন: ব্যভিচার, মদ্যপান, সুদ এবং আল্লাহর শরীয়ত ছাড়া অন্য কিছু অনুযায়ী বিচার করা, তাহলে মুসলিমদের ঐকমত্যে সে কাফের।
আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সবাইকে তাঁর সন্তুষ্টিমূলক কাজ করার তৌফিক দান করেন, আমাদেরকে ও সকল মুসলিমকে তাঁর সরল পথের দিশা দেন। তিনি সর্বশ্রোতা ও নিকটতম সত্তা। আর দরূদ ও সালাম আমাদের নবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার ও সাহাবীদের প্রতি।