কাফেরদের কোন পোশাকগুলো আমাদেরকে পরতে নিষেধ করা হয়েছে?

প্রশ্ন 69789

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় মুসলিমরা পোশাকের ক্ষেত্রে কীভাবে কাফেরদের থেকে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখত? মক্কার কাফেররাও কি লম্বা জামা (যেটা আজ আমরা জাল্লাবিয়্যা বলে চিনি) পরত? সুতরাং প্রশস্ত জামা কি ইসলামসম্মত পোশাক বলে বিবেচিত হবে?

উত্তর

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

পোশাক বান্দাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ নিয়ামত। এটি লজ্জাস্থান ঢেকে রাখে এবং গরম ও ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা করে। আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে বান্দাদের উপর তাঁর অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলেছেন:

 يَا بَنِي آَدَمَ قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآَتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ ذَلِكَ مِنْ آَيَاتِ اللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ

হে আদম সন্তানেরা! আমি তোমাদের লজ্জা নিবারণ ও সাজসজ্জার জন্য পোশাক দিয়েছি। আর তাকওয়ার পোশাক, এটিই সর্বোত্তম। এটি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের একটি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।[সূরা আল-আ’রাফ: ২৬]

তিনি আরও বলেছেন:

وَجَعَلَ لَكُمْ سَرَابِيلَ تَقِيكُمُ الْحَرَّ وَسَرَابِيلَ تَقِيكُمْ بَأْسَكُمْ كَذَلِكَ يُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تُسْلِمُونَ

তিনি তোমাদের জন্য এমন পোশাক দিয়েছেন যা তোমাদের তাপ থেকে রক্ষা করে এবং এমন পোশাকও (বর্ম) দিয়েছেন যা যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে। এভাবেই তিনি তোমাদের উপর তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করেন, যাতে তোমরা (তাঁর কাছে) আত্মসমর্পণ করো।[সূরা আন-নাহল: ৮১]

পোশাকের ক্ষেত্রে মূল অবস্থা হলো বৈধতা। একজন মুসলিম যা ইচ্ছা পরিধান করতে পারেন, তা সে নিজে তৈরি করুক বা মুসলিম কিংবা অমুসলিম কারো দ্বারা তৈরি করানো হোক। সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম মক্কায় এবং অন্যান্য স্থানে এই নীতিতেই ছিলেন। তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করতেন, তিনি বিশেষ কোনো পোশাক পরিধান করতেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শামী জুব্বা ও ইয়েমেনী চাদর পরিধান করতেন, যেগুলোর প্রস্তুতকারীরা মুসলিম ছিলেন না। সুতরাং বিবেচ্য বিষয় হলো পোশাক শরীয়তের শর্তাবলী পূরণ করছে কিনা। পুরুষদের পোশাকের বিধানের সারসংক্ষেপ (36891) নম্বর প্রশ্নের উত্তরে পাওয়া যাবে, সেটি দেখা যেতে পারে।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সাধারণভাবে পোশাক ও অন্যান্য বিষয়ে কাফিরদের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন: যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই একজন।[এটি আবু দাউদ (৪০৩১) বর্ণনা করেছেন এবং ইরাকী ‘তাখরিজ ইহইয়া উলুমুদ্দিন’ (১/৩৪২)-এ ও আলবানী ‘ইরওয়াউল গালীল’ (৫/১০৯)-এ সহীহ বলেছেন]

তিনি বিশেষভাবে পোশাকে কাফিরদের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরনে জাফরান রঞ্জিত দুটি কাপড় দেখে বললেন: এগুলো কাফিরদের পোশাক। সুতরাং এগুলো পরবে না।[হাদীসটি মুসলিম (২০৭৭) বর্ণনা করেন]

মুসলিম (২০৬৯) উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি আজারবাইজানের মুসলিমদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন: তোমরা বিলাসিতা ও মুশরিকদের বেশভূষা থেকে সাবধান থাকো।

কাফিরদের যে পোশাক মুসলিমদের জন্য পরা হারাম, তা হলো এমন পোশাক যা কাফিরদের জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট; অন্য কেউ তা পরে না। কিন্তু যে পোশাক কাফির ও মুসলিম উভয়ে পরে, তা পরতে কোনো সমস্যা নেই এবং এতে কোনো অপছন্দনীয়তাও নেই। কারণ এটি কাফিরদের জন্য নির্দিষ্ট নয়।

কাফিরদের সাথে নিষিদ্ধ সাদৃশ্য সম্পর্কে ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির (লাজনা দায়িমা) আলেমদের জিজ্ঞেস করা হলে তারা উত্তর দিয়েছেন: “কাফিরদের সাথে নিষিদ্ধ সাদৃশ্যের অর্থ হলো: তাদের বিশেষ রীতি-নীতিতে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা এবং তারা দ্বীনে যেসব বিশ্বাস ও ইবাদতে বিদআত প্রবেশ করিয়েছে সেগুলোতে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা, যেমন দাড়ি মুণ্ডনে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা...।

তবে প্যান্ট, স্যুট ও এ জাতীয় পোশাক পরার ক্ষেত্রে কথা হলো: নানাবিধ পোশাকের মূল অবস্থা হলো বৈধতা। কারণ এগুলো স্বভাবগত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ

বলুন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সাজসজ্জা ও পবিত্র জীবিকা (খাদ্যসামগ্রী) সৃষ্টি করেছেন তা কে হারাম করেছে?

তবে, মূল অবস্থার ব্যতিক্রম হলো ঐ পোশাকগুলো শরীয়তের দলিল যেগুলোর হারাম বা মাকরূহ হওয়া প্রমাণ করে। যেমন: পুরুষদের জন্য রেশমের পোশাক, এমন স্বচ্ছ পোশাক যাতে ‘সতর’ (আবরণীয় স্থান) দেখা যায় অথবা এমন আঁটসাঁট পোশাক যে ‘সতর’ -এর আকার বোঝা যায়। কারণ তখন এটি ‘সতর’ খোলা রাখার মতোই, যা জায়েয নেই। এছাড়া যেসব পোশাকে কাফিরদের বিশেষ চিহ্ন রয়েছে, তা পুরুষ বা নারী কারো জন্যই পরা জায়েয নয়। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন। এছাড়া পুরুষের জন্য নারীর পোশাক পরা ও নারীর জন্য পুরুষের পোশাক পরাও নিষিদ্ধ। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষকে নারীর সাদৃশ্য ও নারীকে পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন।

আর ‘প্যান্ট’ নামক পোশাক কাফিরদের জন্য বিশেষ নয়। বরং এটি বহু দেশ ও রাষ্ট্রে মুসলিম ও কাফির উভয়ের মধ্যে সাধারণ পোশাক। কিছু দেশে এ পোশাকের প্রতি মানুষের বিমুখতা রয়েছে অপরিচিতির কারণে এবং সে দেশের অধিবাসীদের পোশাকের রীতির সাথে বিরোধ থাকার কারণে। যদিও এটি অন্য মুসলিম দেশের রীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে যে মুসলিম এমন কোনো দেশে থাকেন যে দেশের মানুষ এই পোশাকে অভ্যস্ত নয়, তার জন্য উত্তম হলো নামাযে, সাধারণ সমাবেশে ও রাস্তাঘাটে এটি না পরা।”[ফাতাওয়াল লাজনাহ আদ-দায়িমাহ (৩/৩০৭-৩০৯)]

তারা আরও বলেছেন: “মুসলিম পুরুষ ও নারীর উচিত ইসলামী আখলাকের প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং আনন্দ-বিষাদ, পোশাক, খাবার, পানীয় ও সকল বিষয়ে ইসলামের পথ অনুসরণ করা।

তাদের জন্য পোশাকে কাফিরদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা জায়েয নেই। যেমন: এমন আঁটসাঁট পোশাক পরা যা সতরের আকার প্রকাশ করে অথবা এমন পাতলা স্বচ্ছ পোশাক যা সতর ঢাকে না বরং প্রকাশ করে অথবা এমন ছোট পোশাক যা বুক, বাহু, গর্দান, মাথা বা মুখ ঢাকে না।”[ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ (৩/৩০৬-৩০৭)]

শায়খ মুহাম্মদ ইবনে সালেহ আল-উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহকে কাফিরদের সাথে সাদৃশ্যের মাপকাঠি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দেন:

‘সাদৃশ্যের মাপকাঠি হলো: যে ব্যক্তি সাদৃশ্য অবলম্বন করছে সে সেই কাজ করবে যা যার সাদৃশ্য অবলম্বন করা হচ্ছে তার জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট। সুতরাং কাফিরদের সাদৃশ্য হলো একজন মুসলিম তাদের বৈশিষ্ট্যগত কোনো কাজ করা।

কিন্তু যা মুসলিমদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এমন হয়ে গেছে যে, এর দ্বারা কাফিরদেরকে আলাদাভাবে চিহ্ণিত করা যায় না, সেটা আর সাদৃশ্য হিসেবে গণ্য হবে না। ফলে শুধু সাদৃশ্যের কারণে তা হারাম হবে না, যদি হারাম হওয়ার অন্য কারণ না থাকে।

আমরা যা বললাম এটিই এই শব্দের নির্দেশনার দাবি। ফাতহুল বারীর রচয়িতাও (১০/২৭২) এমন কথা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন। তিনি বলেন: ‘কিছু সালাফ ‘বুরনুস’ পরাকে মাকরূহ মনে করতেন। কারণ এটি খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের পোশাক ছিল। ইমাম মালিককে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন: কোনো সমস্যা নেই। বলা হলো: কিন্তু এটি তো খ্রিষ্টানদের পোশাক। তিনি বললেন: এটি এখানে পরা হত।’ আমি বলব: ইমাম মালিক যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই হাদীস দিয়ে দলিল দিতেন যে হাদিসে ইহরাম অবস্থায় কী কী পরা যাবে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন: ‘জামা, পায়জামা, বুরনুস... পরা যাবে না” তাহলে সেটি আরও উপযুক্ত হতো।

ফাতহুল বারীতে আরও (১০/৩০৭) আছে: “আর যদি আমরা বলি যে সেগুলোর (অর্থাৎ বেগুনি রঙের গদির) নিষেধাজ্ঞা অনারবদের সাদৃশ্যের কারণে ছিল, তাহলে তা ছিল একটি দ্বীনী কল্যাণের জন্য। কারণ সে সময় এটি তাদের বিশেষ চিহ্ন ছিল এবং তারা ছিল কাফির। এরপর যখন এটি আর তাদের বিশেষ চিহ্ন হিসেবে রইল না, তখন সেই কারণটিও দূর হয়ে গেল। ফলে মাকরূহ বা অপছন্দনীয় হওয়াও দূর হয়ে গেল। আল্লাহই ভালো জানেন।”[মাজমূউ ফাতাওয়াশ শাইখ ইবনে উসাইমীন (১২/২৯০)]

শাইখ সালেহ আল-ফাওযান হাফিযাহুল্লাহ বলেছেন: “কাফিরদের পোশাক মুবাহ (বৈধ) যদি সেগুলোতে নাপাকি আছে মর্মে জানা না যায়। কারণ বস্তুর মূল অবস্থা হলো পবিত্রতা। সন্দেহের দ্বারা পবিত্র অবস্থা দূর হয়ে যায় না। তারা যা বুনেছে বা রং করেছে তাও মুবাহ। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীরা কাফিরদের বোনা ও রং করা পোশাক পরতেন।”[সমাপ্ত][আল-মুলাখখাসুল-ফিকহি (১/২০)]

সারকথা:

একজন মুসলিমের জন্য পোশাক ও অন্যান্য বিষয়ে কাফিরদের সবিশেষ বৈশিষ্ট্যে তাদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করা হারাম। কিন্তু যা কাফিরদের জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট নয়, সেক্ষেত্রে কোনো আপত্তি নেই।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র

পোশাক পরিচ্ছদের বিধিবিধান
হাদিসের ব্যাখ্যা

সূত্র

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

Previous
পরবর্তী
answer

সংশ্লিষ্ট প্রশ্নোত্তরসমূহ

at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android