জামাতের নামাযে ইমাম হলেন আল্লাহর দরবারে মানুষদের অগ্রবর্তী প্রতিনিধি। ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠান তথা নামাযে তিনি তাদের নেতৃত্ব দেন। তাই তার নামাযের অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। তার নামাযের সাথে মুক্তাদীদের নামাযের অনেক হুকুমে জড়িয়ে গিয়েছে। এই উদ্দেশ্যগুলোকে জমা করেছে আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “ইমাম হচ্ছেন জিম্মাদার, আর মুয়াজ্জিন হচ্ছেন আমানতদার (ওয়াক্ত ও নামাযের)। হে আল্লাহ! আপনি ইমামদের সুপথে পরিচালিত করুন এবং মুয়াজ্জিনদের ক্ষমা করুন।” [হাদীসটি আবু দাউদ (৫১৭) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী সহীহু আবি দাউদে হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন]।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা: “ইমাম হচ্ছেন জিম্মাদার” এর মধ্যে জিম্মাদারির অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোর ব্যাপারে আলেমরা ‘জামাতে নামায’ সংক্রান্ত অধ্যায়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন:
ইমাম জিম্মাদার, অর্থাৎ মুক্তাদীদের নামায বাতিল হওয়া থেকে রক্ষা করা এবং নামাযের রাকাত-সংখ্যা ঠিক রাখা ইমামের উপর ওয়াজিব। ইমাম মুসল্লিদের নিয়ে নামায পড়াকালে এমনভাবে ঠোকর দিবে না যাতে করে নামাযের রুকনগুলোতে ঘাটতি হয়। নামাযের শর্তগুলোর ব্যাপারে যত্নবান হওয়া এবং নামাযের সুন্নত, কাঠামো ও অনুরূপ বিষয়গুলো পালনে কসুর না করা।
ইমাম জিম্মাদার হওয়ার অর্থ তিনি ক্বিরাত প্রকাশ্যে পঠিতব্য নামাযে মুক্তাদীর পক্ষ থেকে তেলাওয়াতের ভার বহন করবেন। মুক্তাদীর ছোট সূরা পড়ার ভারও তিনি বহন করবেন। অনুরূপভাবে মুক্তাদী যদি ভুলবশতঃ কিছু সুন্নত বাদ দেয়, সেটাও ইমাম তার পক্ষ থেকে বহন করবেন। এমনকি মুক্তাদী যদি মাসবুক হিসেবে নামাযে আসে, তাহলে তার ফাতেহা পাঠের ভারও তিনি বহন করবেন। এ সবই জিম্মাদারীর এমন অর্থে প্রবেশ করে, যার ব্যাপারে সবাই সম্মত।
ইমাম জিম্মাদার হওয়ার অর্থ তিনি সমস্ত মুক্তাদীকে নিয়ে কুনুত পড়লে বা দোয়া করলে তাদের পক্ষ থেকে দোয়া করার জিম্মাদার। তিনি মুক্তাদীদেরকে নামাযের বিধি-বিধান শিখিয়ে দেওয়ার ব্যাপারেও জিম্মাদার, যেন তাদের নামায নষ্ট না হয় কিংবা তারা পূর্ণাঙ্গ সওয়াব থেকে বঞ্চিত না হয়।
খাত্তাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “নবীজীর বক্তব্য: ‘ইমাম দামিন (জিম্মাদার)’-এর ব্যাপারে ভাষাবিদরা বলেন: আরবদের ভাষায় ‘আদ-দামিন’ (الضامن) অর্থ হলো: রক্ষক বা তত্ত্বাবধায়ক। الضمان (আদ-দামান) অর্থ হলো: রক্ষণাবেক্ষণ বা যত্ম নেওয়া। কবি বলেন:
মালেকের মা! আল্লাহর জিম্মাদারী তোমাকে সংরক্ষণ করুক। আল্লাহ তোমাকে দুর্ভাগা করার তুলনায় অধিক স্বয়ংসম্পূর্ণ ও উদার (তিনি এমনটা করবেন না)।
ইমাম জিম্মাদার অর্থ হলো তিনি লোকদের নামায ও রাকাত-সংখ্যার হেফাযত করেন।
আরও বলা হয়: এর অর্থ হলো দোয়ার জিম্মাদার। তিনি সবার জন্য ব্যাপকভাবে দোয়া করবেন, তাদেরকে রেখে নিজের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করবেন না। যে ‘দামান’ (গ্যারান্টি) জরিমানা বহন করা আবশ্যক করে এর সাথে সেটার কোনো সম্পর্ক নেই।
কিন্তু, একদল লোক শব্দটিকে এই অর্থেই ব্যাখ্যা করেছেন যে: তিনি (ইমাম) কিছু কিছু অবস্থায় তাদের পক্ষ থেকে তেলাওয়াত করার দায়িত্ব বহন করেন, আবার মুক্তাদী রুকু অবস্থায় ইমামকে পেলে (রুকুর আগের) দাঁড়িয়ে থাকার দায়িত্বটাও তিনি বহন করেন।” [মা‘আলেমুস সুনান (১/১৫৬) থেকে সমাপ্ত]
বদরুদ্দীন আইনী রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
“আদ-দামান (الضمان) এর মূল অর্থ হলো: যত্ন নেওয়া ও সংরক্ষণ করা। যেহেতু ইমাম লোকদের নামায সংরক্ষণ করেন।
কারো কারো মতে: যেহেতু তিনি তাদের পক্ষ থেকে তেলাওয়াত করার দায়িত্ব বহন করেন। তারা রুকু অবস্থায় নামায পেলে তিনি তাদের পক্ষ থেকে (রুকুর আগে) দাঁড়ানোর ভার বহন করে নেন।
কারো কারো মতে: মুক্তাদীদের নামায তার (ইমামের) দায়িত্বে। তার নামায ঠিক হওয়ার উপর মুক্তাদীদের নামায ঠিক হওয়া নির্ভরশীল। তিনি যেন তাদের নামায সঠিক হওয়ার জিম্মাদার।
কারো কারো মতে: দোয়ার জিম্মাদার। তিনি তাদের জন্য ব্যাপকভাবে দোয়া করবেন, তাদেরকে বাদ দিয়ে নিজের জন্য দোয়া করবেন না।”
[শারহু সুনানে আবু দাউদ (২/৪৬৮)]
শাওকানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: الإمام ضامن (ইমাম জিম্মাদার)। الضمان (আদ-দামান) এর আভিধানিক অর্থ হলো: তত্ত্বাবধান, সংরক্ষণ ও যত্ন নেওয়া।
কথাটি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: তারা অর্থাৎ ইমামরা গোপনে ক্বিরাত পড়া ও যিকির করার ক্ষেত্রে জিম্মাদার। এ ব্যাখ্যা শাফেয়ী থেকে আল-উম্ম বইয়ে বর্ণিত হয়েছে।
কারো কারো মতে: এর দ্বারা উদ্দেশ্য দোয়ার জিম্মাদারী। অর্থাৎ মুসল্লি সবার জন্য ব্যাপকভাবে দোয়া করবেন; নিজের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করবেন না।
কারো কারো মতে: যেহেতু তিনি মাসবুকের (বিলম্বে জামাতে যোগদানকারীর) পক্ষ থেকে দাঁড়ানো ও ক্বিরাত পড়ার দায়িত্ব বহন করেন।” [সমাপ্ত] [নাইলুল আওত্বার (২/৪২)]
এই হাদীস থেকে আলেমরা সেটা বোঝেননি কিছু মানুষ যা বুঝেছে। অর্থাৎ যদি ইমামের নামায শুদ্ধ হলে মুক্তাদীর নামাযও শুদ্ধ হবে, মুক্তাদী যতই ভুল করুক না কেন। আর ইমামের নামায শুদ্ধ না হলে মুক্তাদীর নামাযও শুদ্ধ হবে না, যদিও সে নামাযের রুকন ও শর্তাবলি ঠিকভাবে পালন করে।
বরং আলেমরা বলেন: মুক্তাদী নামাযে যে ভুলগুলো করতে পারেন সেগুলো হতে পারে:
১- এমন ভুল যা নামাযকে বাতিল করে দেয়। যেমন: অযু না-থাকা, নাপাকি লেগে যাওয়া, খাওয়া, পান করা, হাসি দেওয়া প্রভৃতি নামায ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ। অনুরূপভাবে রয়েছে ইচ্ছাকৃত নামাযের কোনো একটা রুকন ত্যাগ করা। এই ভুলগুলো মুক্তাদীর নামাযকে বাতিল করে দেয়। আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে ইমাম এর কোনোটার দায়িত্ব বহন করে না।
২- এমন ভুল যা নামাযকে বাতিল করে দেয় না। যেমন: কিছু সুন্নত ও কাঠামো ত্যাগ করা কিংবা এদিক সেদিক তাকানো, মুচকি হাসি দেওয়াসহ অনুরূপ কিছু ভুল করা যেগুলো নামাযকে বাতিল করে না। অথবা কিছু ওয়াজিব পালন করতে ভুলে যাওয়া, যেমন: প্রথম বৈঠকে তাশাহ্হুদ পড়তে ভুলে যাওয়া। অথবা রুকু-সিজদার তাসবীহ পড়তে ভুলে যাওয়া অথবা এর অনুরূপ যা কিছু আছে। ইমামের নামায এগুলোর ক্ষতিপূরণ করে দেয়। আর জামাতে নামায পড়ার সওয়াব ব্যক্তির যে ভুল-ত্রুটি বা ঘাটতি হয়ে থাকে, সেগুলোর প্রতিকার করে দেয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “ইমাম জিম্মাদার”-এর অর্থ নিয়ে মতভেদের প্রেক্ষিতে চার মাযহাবের ফকীহরা কিছু ফিকহী মাসআলায় মতভেদ করেছেন। এগুলো আলেমদের মতভেদ সংক্রান্ত বিস্তারিত বইয়ে দেখা যেতে পারে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।