নিম্নস্তরের পেশা ও উচ্চস্তরের পেশা বা কর্মের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান

প্রশ্ন 133060

ইসলামে নিম্নস্তরের পেশা ও উচ্চস্তরের পেশা এমন কিছু কি আছে? কর্মক্ষেত্রে উচ্চ পদ লাভের জন্য ব্যক্তির আগ্রহ-আকাঙ্ক্ষা কি তুষ্টির সাথে সাংঘর্ষিক? কখন এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা তুষ্টির সাথে সাংঘর্ষিক হবে? সামাজিক প্রতিপত্তি নিশ্চিত করে এমন পেশার জন্য মানুষের আগ্রহ কি যুহদ (দুনিয়াবিমুখতা) এবং দুনিয়াকে সর্বোচ্চ লক্ষ্য না করার সাথে সাংঘর্ষিক? নাকি এটি স্বাভাবিক বিষয় যেটাকে শরীয়ত নিষেধ করে না?

উত্তর

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

এক:

আল্লাহ এই দুনিয়াকে আখিরাতের বাহন করেছেন। দুনিয়াকে তিনি এমন একটি মাধ্যম করেছেন যার দ্বারা মানুষ আখিরাতের বিষয়ে সহায়তা গ্রহণ করে। তাই আল্লাহ তার কিতাবে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন যে তিনি যমীন এবং এতে থাকা সকল কিছু মানুষের জন্য নিয়োজিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الأرْضِ جَمِيعاً

তিনি সেই সত্তা যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।[সূরা বাকারা: ২৯]

هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الأرْضَ ذَلُولاً فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رِزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ

তিনি পৃথিবীকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন; অতএব, তোমরা পৃথিবীর পথে-প্রান্তরে বিচরণ কর এবং আল্লাহর দেওয়া জীবিকা থেকে আহার করো। তাঁর কাছেই (প্রত্যবর্তনের জন্য তোমাদের) পুনরুত্থান হবে।[সূরা মুলক: ১৫]

ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন:

‘অর্থাৎ তোমরা এই পৃথিবীর যেখানে ইচ্ছা হয় সফর করো। তোমরা ব্যবসা ও উপার্জনের জন্য নানান দেশে ও প্রান্তরে ঘুরে বেড়াও।’[তাফসীর ইবনে কাসীর (৮/১৭৯)]

বহু আয়াত ও হাদীসে উপার্জন করার প্রতি এবং পৃথিবীতে বিচরণ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এ সবগুলোর পেছনে উদ্দেশ্য হলো অর্থ উপার্জন করা। এটি শুধু সঞ্চয়ের জন্য নয়; বরং আত্মসম্মান বজায় রাখা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা এবং আল্লাহর আনুগত্যে এই অর্থের সাহায্য নেওয়া।

ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ অর্থের মর্যাদা ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন:

‘আল্লাহ তার কিতাবের একাধিক স্থানে সম্পদকে ‘খাইর’ তথা কল্যাণ বলে অভিহিত করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন:

كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِنْ تَرَكَ خَيْراً الْوَصِيَّةُ لِلْوَالِدَيْنِ وَالأقْرَبِينَ

তোমাদের কেউ মৃত্যুকালে ‘খাইর’ (সম্পদ) রেখে গেলে পিতামাতা ও আপনজনদের জন্য ন্যায্যভাবে অসিয়ত করে যাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।[সূরা বাকারা: ৮]

এছাড়া তিনি বলেন:

وَإِنَّهُ لِحُبِّ الْخَيْرِ لَشَدِيدٌ

“খাইরের (সম্পদের) ভালোবাসায় সে শক্ত (অনড়)।[সূরা আদিয়াত: ৮]

মহান আল্লাহ সম্পদকে মানুষের জীবনের ভিত্তি হিসেবে স্থাপন করেছেন এবং তা সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি নিষেধ করেছেন যেন সম্পদ নির্বোধ নারী ও ছেলে-মেয়েদের হাতে দেয়া না হয়।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পদের প্রশংসা করে বলেছেন: সৎ মানুষের জন্য সৎ সম্পদ কতই না উত্তম![ইমাম আহমদ সহিহ সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন]

সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “তার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই— যে হালাল উপায়ে সম্পদ অর্জন করতে চায় না; যাতে এর মাধ্যমে মানুষের কাছে হাত পাততে না হয়, এর মাধ্যমে সে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে পারে এবং সম্পদের হকও আদায় করতে পারে।”

আবু ইসহাক আস-সাবী‘ঈ বলেছেন: “তারা (পূর্বসূরীরা) মনে করতেন, প্রাচুর্য (ধনসম্পদ) দ্বীন পালনে সহায়ক।” মুহাম্মদ ইবনুল মুনকাদির বলেছেন: “তাকওয়ার পথে ধনসম্পদ কতই না উত্তম সহায়ক।” সুফিয়ান আস-সাওরী বলেছেন: “আমাদের এই যুগে সম্পদ হলো মুমিনের অস্ত্র।” ইউসুফ ইবনে আসবাত বলেছেন: “দুনিয়া সৃষ্টির পর থেকে কোনো যুগে সম্পদ এই যুগের মতো এত উপকারী ছিল না...।”

মহান আল্লাহ সম্পদকে দেহ সংরক্ষণের মাধ্যম করেছেন। আর দেহ সংরক্ষণ হলো আত্মা সংরক্ষণের মাধ্যম; যে আত্মা আল্লাহকে চেনা, তাঁর প্রতি ঈমান আনা, তাঁর রাসূলদেরকে সত্যায়ন করার, তাঁকে ভালোবাসা এবং তাঁর অভিমুখী হওয়ার পাত্র। সুতরাং সম্পদ দুনিয়া ও আখিরাত উভয়েরই আবাদের একটি কারণ।

সম্পদের উপকারিতাসমূহের মাঝে আরো রয়েছে:

এটি ইবাদত ও আনুগত্যের ভিত্তি। এর মাধ্যমেই হজ ও জিহাদের মতো নেক কাজ চালু থাকে। এর দ্বারাই ফরজ ও নফল খরচ আদায় করা সম্ভবপর হয়। এর মাধ্যমেই দাসমুক্তি, ওয়াকফ, মসজিদ নির্মাণ, সেতু ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজ সম্পন্ন হয়। এর সাহায্যে বিবাহ করা সম্ভবপর হয়; যা একাকী নফল ইবাদতে নিমগ্ন থাকার চেয়ে উত্তম। এর উপরই ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত। এর দ্বারাই দানশীলতা ও উদারতার গুণ প্রকাশ পায়। এর মাধ্যমে মান-সম্মান রক্ষা করা যায়। এর সাহায্যে ভাই ও বন্ধু অর্জিত হয়। এর মাধ্যমেই সৎলোকেরা উচ্চ মর্যাদা ও আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্তদের সান্নিধ্য লাভ করে। সুতরাং সম্পদ এমন এক সিঁড়ি, যার দ্বারা জান্নাতের উচ্চ কক্ষে আরোহণ করা যায়, আবার তা দিয়েই সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যাওয়া যায়। এটি সম্মানিত ব্যক্তির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে। তাই কিছু সালাফ বলতেন: “কর্ম ছাড়া সম্মান নেই, আর সম্পদ ছাড়া কর্ম সম্ভব নয়।”

আবার কেউ কেউ বলতেন: “হে আল্লাহ! আমি আপনার সেসব বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত স্বচ্ছল হওয়াই যাদের জন্য উপযুক্ত।”

এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণও হতে পারে, আবার তাঁর অসন্তুষ্টির কারণও হতে পারে।’[উদ্দাতুস সাবিরীন, পৃষ্ঠা ২২১–২২৩ থেকে সংক্ষেপিত]

এই মহৎ উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য নবী ও রাসূলগণ বিভিন্ন পেশা ও কর্মে নিযুক্ত ছিলেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ এমন কোনো নবী প্রেরণ করেননি, যিনি মেষ চরাননি। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন: আপনিও কি? তিনি বললেন: হ্যাঁ, আমি মক্কার লোকদের জন্য কয়েক কিরাতের বিনিময়ে মেষ চরাতাম।[হাদীসটি বুখারী (২১৪৩) বর্ণনা করেছেন]

তদ্রূপ আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচা আবু তালিবের সঙ্গে ব্যবসা করতেন এবং পরে তাঁর স্ত্রী খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার সম্পদ নিয়ে ব্যবসা করেছেন, যেমনটি সীরাতগ্রন্থে প্রসিদ্ধ।

আরেক হাদীসে এসেছে, আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যাকারিয়া আলাইহিস সালাম ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রি।[হাদীসটি মুসলিম (২৩৭৯) বর্ণনা করেছেন]

দাউদ আলাইহিস সালামের কাজ সম্পর্কে আল্লাহ আমাদের জানিয়ে বলেছেন:

وَسَخَّرْنَا مَعَ دَاوُدَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرَ وَكُنَّا فَاعِلِينَ وَعَلَّمْنَاهُ صَنْعَةَ لَبُوسٍ لَكُمْ لِتُحْصِنَكُمْ مِنْ بَأْسِكُمْ فَهَلْ أَنْتُمْ شَاكِرُونَ

আমরা পর্বতসমূহ ও পাখিদেরকে দাউদের অধীন করেছিলাম; তারা (আমার) পবিত্রতা বর্ণনা করত। এসব আমরাই করেছিলাম। আমরা তাকে তোমাদের জন্য বর্ম তৈরি করা শিখিয়েছিলাম, যাতে তা যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে। তোমরা কি (এর জন্য) কৃতজ্ঞ?[সূরা আম্বিয়া: ৭৯-৮০]

খালিদ ইবনে মা’দান বর্ণনা করেন: মিকদাম রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: নিজের হাতের কামাই থেকে উত্তম খাবার কেউ কখনো খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ আলাইহিস সালাম নিজ হাতের কামাই থেকে খেতেন।[হাদীসটি বুখারী (১৯৬৬) বর্ণনা করেন]

দাউদ আলাইহিস সালাম ছিলেন নবী ও রাজা। আল্লাহ তাঁকে বৃহৎ রাজ্য দিয়েছিলেন। এতদসত্ত্বেও তিনি নিজ হাতের উপার্জন থেকে খেতেন। তিনি লোহার বর্ম তৈরি করে তা বিক্রি করতেন।

ইসলাম অর্থ ও রিযিক অন্বেষণে যমীনে ঘুরে বেড়ানোর প্রতি তাগিদ প্রদান করেছে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: উকায ও যুল-মাজায নামক স্থানগুলোতে জাহেলী যুগে মানুষের বাজার ছিল। তাই ইসলাম আসার পর মুসলমানেরা যেন এই স্থানগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্য করা অপছন্দ করছিল। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো:

لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَبْتَغُوا فَضْلاً مِنْ رَبِّكُمْ

তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ কামনায় (ব্যবসা-বাণিজ্যে) কোন দোষ নেই। অর্থাৎ হজ্জের মওসুমে।[হাদীসটি বুখারী (১৬৮১) বর্ণনা করেন]

এই মর্মে ফিকাহবিদ ও হাদিসবিদগণ স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে কিতাবুল বুয়ূ (ক্রয়-বিক্রয় অধ্যায়)-এর একটি পরিচ্ছেদের শিরোনাম দিয়েছেন: “ব্যবসার উদ্দেশ্যে বের হওয়া এবং আল্লাহর বাণী: ‘তোমরা যমীনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করো[সূরা জুমুআ: ১০]” তারপর তিনি উমরের সাথে আবু মুসা আল-আশআরীর হাদীস ও উমরের বাণী: “বাজারের ক্রয়-বিক্রয় (অর্থাৎ ব্যবসার জন্য বের হওয়া) আমাকে উদাসীন রেখেছে” উল্লেখ করেছেন।[হাদীসটি বুখারী (১৯৫৬) ও মুসলিম (২১৫৩) বর্ণনা করেছেন]

হাফেয ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘ইবনুল মুনায়্যির তার টীকায় বলেছেন: বুখারীর উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যবসার জন্য যাত্রার বৈধতা প্রদান, যদিও সেটি দূরবর্তী যাত্র হয়ে থাকে। এটি এমন ব্যক্তির জবাব যে বাড়াবাড়ি করে এবং বাজারে আসে না।’[ফাতহুল বারী (৪/৩৪৯)]

এছাড়াও বুখারী আরো শিরোনাম দিয়েছেন: ‘সমুদ্রে ব্যবসা সংক্রান্ত পরিচ্ছেদ’, ‘স্বর্ণকারদের সম্পর্কে যা বলা হয়েছে’, ‘তীরের ফলক নির্মাতা ও কর্মকার সংক্রান্ত পরিচ্ছেদ’, ‘দর্জি সংক্রান্ত পরিচ্ছেদ’, ‘তাঁতী সংক্রান্ত পরিচ্ছেদ’, ‘কাঠমিস্ত্রি সংক্রান্ত পরিচ্ছেদ’ ... ইত্যাদি।

এই সমস্ত পরিচ্ছেদ ও হাদীসসমূহের দ্বারা বুখারীর উদ্দেশ্য হচ্ছে: কর্ম ও পেশার বৈধতার পক্ষে দলীল প্রদান করা।

অতএব, কিছু মানুষ যে ধারণা করে, ইসলাম অর্থ উপার্জন ও কাজকর্ম করতে উদ্বুদ্ধ করে না; এমন ধারণা ভুল।

বহু মানুষ যে কিছু পেশাকে নিকৃষ্ট মনে করে যেমন: কাঠমিস্ত্রি, কর্মকার, পশু চরানো— এটি ঠিক নয়। তাদের এই কথা প্রত্যাখ্যান করার জন্য এটিই যথেষ্ট যে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তথা নবী-রাসূলেরা এই পেশাগুলোতে নিযুক্ত ছিলেন।

দুই:

মানুষ উচ্চস্তরের পেশায় যাবে এবং ভালো চাকরিতে নিয়োজিত হবে— ইসলাম এর বিরোধিতা করে না। বরং ইসলাম এতে উৎসাহিত করে। মানুষ যেন সর্বোত্তম অবস্থায় থাকে, পরিপূর্ণ জীবনযাপন করে; এমনকি আরও ভালো ও শ্রেষ্ঠ অবস্থা অর্জনের জন্য চেষ্টা করে—ইসলাম এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। তবে শর্ত হলো: এটি যেন তার দ্বীনদারি ও দ্বীনি অটলতার উপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে। এই জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম ও আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়; যদিও উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।[হাদীসটি মুসলিম (২৬৬৪) বর্ণনা করেছেন] এখানে خير (কল্যাণ) শব্দটি অনির্দিষ্ট (নাকিরা); যা দুনিয়া ও আখিরাতের সব ধরনের কল্যাণকে অন্তর্ভুক্ত করে।

ইসলাম কিছু নীচু ও অবমাননাকর পেশা অবলম্বন করাকে অপছন্দ করে এবং মুসলিমকে সেগুলো থেকে আত্মসম্মান বজায় রেখে দূরে থাকতে বলে। যেমন হাদিসে এসেছে: ইবনু মুহাইয়্যিসা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে শিঙ্গা লাগিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণের অনুমতি চাইলে তিনি তাকে নিষেধ করেন। তিনি বারবার অনুমতি চাইতে থাকলে শেষ পর্যন্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এর উপার্জন দিয়ে তোমার উটকে খাওয়াও এবং তোমার দাসকে আহার করাও।[হাদীসটি আবু দাউদ (৩৪২২) ও তিরমিযী (১২৭৭) বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী এটিকে হাসান বলেছেন]

হাফেজ ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘শিঙ্গাদারের উপার্জন সম্পর্কে আলেমদের মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ আলেমের মত হলো: তা হালাল...। তবে তারা বলেন: এটি এমন উপার্জন যাতে নীচুতা আছে; কিন্তু হারাম নয়। তারা এর থেকে নিষেধাজ্ঞাকে অপছন্দনীয় (মাকরূহ) অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন।’[ফাতহুল বারী, (৪/৪৫৯)]

তিনি আরও বলেন: ‘কারণ এটি নীচুস্তরের উপার্জন বলে শরিয়ত অনুমোদিত না হওয়া অনিবার্য নয়। যেহেতু ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারকারীর অবস্থা শিঙ্গাদারের চেয়েও খারাপ। কিন্তু সব মানুষ যদি একযোগে এ কাজ ছেড়ে দেয় তবে সেটা তাদের সবার জন্য ক্ষতিকর হবে।’[ফাতহুল বারী: (৪/৩২৪)]

ইবনে কুদামা রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বাধীন ব্যক্তির জন্য এ কাজ করাকে অপছন্দ করেছেন কেবল নীচু পেশা হওয়ার কারণে; নিষিদ্ধ করার জন্য নয়। আর তিনি দাসকে এ উপার্জন থেকে খাওয়ানোর নির্দেশ দেওয়া প্রমাণ করে যে তা বৈধ। সুতরাং এর উপার্জন ভক্ষণ করা থেকে নিষেধাজ্ঞাকে হারাম অর্থে নয়; বরং মাকরূহ অর্থে গ্রহণ করাই নির্দিষ্ট।‘[আল-মুগনী: (৬/১৩৩)]

পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়: এমন কিছু পেশা ও কাজ আছে যেগুলোকে প্রচলিত অর্থে ‘নীচু পেশা’ বলা যায়। যেমন: শিঙ্গা লাগানো (হিজামা), ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় কাজ করা ইত্যাদি।

এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য:

১. কোনো পেশাকে ‘নীচু’ বলা মানেই তাতে কাজ করা হারাম, এ কথা বোঝায় না। ইতিপূর্বে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

২. হতে পারে কিছু মানুষের জন্য এসব পেশাই উপযুক্ত। কারণ তারা অন্য কোনো কাজ ভালো পারে না। এমন অবস্থায় এসব কাজে নিয়োজিত থাকা তাদের জন্য বেকার বসে থাকা বা মানুষের কাছ থেকে সদকা নেয়ার চেয়ে উত্তম।

৩. মুসলিম সমাজে এসব পেশার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। বরং এগুলো অত্যাবশ্যক। কয়েক দিন ময়লা না সরালে সমাজে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়বে এবং রোগব্যাধি ও মহামারি ছড়িয়ে পড়বে। তাই ইসলামী রাষ্ট্রের কর্তব্য হলো: এসব পেশার মানুষদের সম্মান দেওয়া এবং তাদের জন্য প্রণোদনামূলক সুবিধা প্রদান করা; যাতে লোকজন এসব কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেয়।

৪. যারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দুর্বল অথবা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে এসব পেশায় কাজ করতে বাধ্য হয়েছে, তাদেরকে অপমান করা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা উচিত নয়। কারণ এসব পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা নিঃসন্দেহে তাদের চেয়ে উত্তম, যারা মানুষের কাছে হাত পাতে এবং নিজেদেরকে লাঞ্ছনার সম্মুখীন করে।

তিন:

ইসলাম মানুষকে দ্বীনী বা দুনিয়াবি পূর্ণতা অর্জনের প্রতি উৎসাহিত করে। এটি আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য যে রিযিক ও অবস্থান নির্ধারণ করে রেখেছেন এর প্রতি সন্তুষ্ট থাকার পরিপন্থী নয়। কারণ এগুলো অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হলো যথাযথ উপায় অবলম্বন করা। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রজ্ঞাবলে ও ব্যবস্থাপনায় যে কারণসমূহ সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো অবলম্বন করলে সাধারণত সেগুলোর ফলাফল অর্জিত হয়।

কিন্তু, মানুষ যদি আল্লাহর অনুমোদিত পথ ছাড়া অন্য পথে তা অর্জন করতে চায়, যেমন: গুনাহের মাধ্যমে, প্রতারণা, ধোঁকাবাজি ও মিথ্যার মাধ্যমে অথবা ঘুষ দেয়ার মাধ্যমে এবং তার প্রধান লক্ষ্য যদি হয় এসব দুনিয়াবি উপকারগুলো অর্জন করা; এগুলোকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় না করা; সেক্ষেত্রে এটি আল্লাহ কর্তৃক যা নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে এর প্রতি সন্তুষ্ট  থাকার পরিপন্থী এবং তাঁর অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়া।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের সম্পদ ও পদমর্যাদার প্রতি লালসার ব্যাপারে একটি মহান উপমা পেশ করেছেন। কা‘ব ইবনে মালিক আল-আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই্হি ওয়াসাল্লাম বলেন: ক্ষুধার্ত দু’টি নেকড়ে যদি ভেড়ার পালের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তারা যেভাবে ভেড়ার পালকে ধ্বংস করবে, সম্পদ ও সম্মানের প্রতি লোভ ব্যক্তির দ্বীনদারির জন্য এর চেয়েও বেশি ধ্বংসাত্মক।[হাদীসটি তিরমিযী (২৩৭৬) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী সুনানুত তিরমিযীতে হাদীসটিকে সহিহ বলে গণ্য করেছেন]

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘নিঃসন্দেহে দুনিয়ার জীবনের সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতি অতিরিক্ত লোভ ও আকাঙ্ক্ষা ক্ষতিকর। যেমনটি তিরমিযী কা‘ব ইবনে মালিক আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই্হি ওয়াসাল্লাম বলেন: ক্ষুধার্ত দু’টি নেকড়ে যদি ভেড়ার পালের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তারা যেভাবে ভেড়ার পালকে ধ্বংস করবে, সম্পদ ও সম্মানের প্রতি লোভ ব্যক্তির দ্বীনদারির জন্য এর চেয়েও বেশি ধ্বংসাত্মক। তারপর তিনি বলেন: হাদীসটি হাসান সহিহ।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পদ ও সম্মান (অর্থাৎ নেতৃত্ব ও ক্ষমতা)-এর প্রতি লালসাকে নিন্দা করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, তা দ্বীনদারিকে এমনভাবে নষ্ট করে দেয় ঠিক যেভাবে ক্ষুধার্ত দু’টি নেকড়ে ভেড়ার খামারকে ধ্বংস করে দেয় কিংবা এর চেয়ে জঘন্যভাবে ধ্বংস করে দেয়।’[মাজমূউল ফাতাওয়া (২০/১৪২)]

ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘সম্পদ নিজে নিন্দনীয় নয়; বরং নিন্দনীয় হলো: যা অবৈধ পথে উপার্জন করা হয়, অবৈধ কাজে ব্যয় করা হয় এবং যা এর মালিককে দাস বানিয়ে ফেলে, তার অন্তরকে দখল করে নেয় এবং তাকে আল্লাহ ও আখিরাত থেকে উদাসীন করে রাখে।

সুতরাং সেই সম্পদের নিন্দা করা হবে যা মানুষকে ভ্রান্ত গন্তব্যে পৌঁছে দেয় বা তাকে মহৎ গন্তব্যে থেকে বিরত রাখে। সুতরাং নিন্দা হচ্ছে ব্যক্তির; বস্তুর নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ধ্বংস হোক দীনার ও দিরহামের দাস, নকশী চাদর ও মখমলের চাদরের দাস।[হাদীসটি বুখারী (২৭৩০) বর্ণনা করেন] হাদিসে তিনি দাসত্বকারীর নিন্দা করেছেন; মুদ্রা ও মখমলের নয়...।’[উদ্দাতুস সাবিরীন: (পৃ. ২২১–২২২)]

আর দুনিয়াবিমুখীতা (যুহদ): সম্পদ উপার্জন ও মর্যাদাপূর্ণ চাকরি গ্রহণের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। এ বিষয়ে (105352) নং প্রশ্নের উত্তরে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

শেষ কথা:

জেনে রাখা আবশ্যক যে, মর্যাদাপূর্ণ পদ ও উচ্চ পদবী অন্বেষণ করা কেবল তার জন্য বৈধ হবে, যিনি তা ন্যায্যভাবে গ্রহণ করবেন এবং তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি তা অন্যায়ভাবে গ্রহণ করবে অথবা এক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করবে না, তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে না; বরং এ পদবীকে মানুষের ওপর যুলুম করা ও মানুষকে নির্যাতন করা ও ক্ষমতা জাহির করার হাতিয়ার বানাবে কিংবা হারাম উপায়ে সম্পদ উপার্জনের মাধ্যম বানাবে; তবে সেই পদ ও ক্ষমতা কিয়ামতের দিন তার জন্য লাঞ্ছনা ও বিপদের কারণ হবে।

এ প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “অচিরেই তোমরা নেতৃত্বের প্রতি লোভ করবে। কিন্তু তা কিয়ামতের দিন অনুতাপের কারণ হবে।[হাদীসটি বুখারী (৭১৪৮) বর্ণনা করেন]

সহিহ মুসলিমে (১৮২৫) আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাকে কোনো দায়িত্ব দেবেন না? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন: হে আবু যর! তুমি দুর্বল, আর এটি (নেতৃত্ব) আমানত। আর কিয়ামতের দিন তা হবে লাঞ্ছনা ও অনুতাপের বিষয়। তবে ঐ ব্যক্তি ছাড়া, যে যথাযথভাবে সেটাকে গ্রহণ করেছে এবং তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছে।

ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় বলেন:

“এই হাদিসটি শাসনক্ষমতা ও দায়িত্বপূর্ণ পদ এড়িয়ে চলার ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। বিশেষতঃ সেই ব্যক্তির জন্য, যার এসব দায়িত্ব পালনে দুর্বলতা রয়েছে। আর লাঞ্ছনা ও অনুতাপ তাদের জন্য যারা এর যোগ্য ছিল না কিংবা যোগ্য হয়েও দায়িত্ব পালনে ন্যায়বিচার করেনি। তাই আল্লাহ তাদেরকে কিয়ামতের দিন অপমান করবেন ও (প্রকৃত অবস্থা) প্রকাশ করে দেবেন এবং তারা নিজেদের অবহেলার জন্য অনুতপ্ত হবে। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি এর যোগ্য ছিল এবং দায়িত্ব পালনে ন্যায়বিচার করেছে তার জন্য রয়েছে সহীহ হাদিসসমূহে প্রমাণিত মহান মর্যাদা। যেমন ‘সাত শ্রেণির মানুষ যাদেরকে আল্লাহ তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দেবেন ...’ এই হাদীসসহ অন্যান্য হাদীস। এ বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর ইজমা (ঐকমত্য)ও রয়েছে। তবুও যেহেতু এতে বড় ঝুঁকি আছে, তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে এর থেকে সতর্ক করেছেন। তেমনিভাবে আলেমরাও সতর্ক করেছেন। সালাফদের অনেকেই এসব দায়িত্ব গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছেন এবং বিরত থাকতে গিয়ে নির্যাতন সহ্য করেছেন।”[সমাপ্ত]

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র

চাকুরী সংক্রান্ত বিধিবিধান

সূত্র

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

Previous
পরবর্তী
answer

সংশ্লিষ্ট প্রশ্নোত্তরসমূহ

at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android