ওয়েবসাইট ডিজাইনের কাজ করার হুকুম

প্রশ্ন 105325

আমি ওয়েবসাইট ডিজাইনের কাজ করি। আমি যে ওয়েবসাইটগুলো ডিজাইন করি, সেগুলোতে মহিলাদের ছবি নেই। শরয়ী শিষ্টাচার লঙ্ঘন হয় এমন কোনো ছবিও নেই। আমার ডিজাইনে আমি মিউজিক বা ভিডিও দিই না। শুধু ওয়েবসাইটের কাঠামো সাজিয়ে দিই। আমার জন্য কি এতে কোনো সমস্যা আছে? আমি যে অর্থ উপার্জন করি সেটা কি হালাল; নাকি হারাম? আমি যে ওয়েবসাইটটা ডিজাইন করেছি, সেটার ক্রেতা যদি পরবর্তীতে ঐ ওয়েবসাইটে গান ও ছবিসহ বিভিন্ন হারাম জিনিস অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে কি আমার পাপ হবে? ওয়েবসাইট ডিজাইনের সময় বাচ্চাদের ছবি দিতে কি কোনো সমস্যা আছে?

উত্তর

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

বর্তমান সময়ে পাপের সয়লাবের ফলে যে সকল বিষয়ে সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, তার মাঝে অন্যতম হলো এই বিষয়টি। হারামের পদ্ধতি ও উপকরণ নানান রকম হয়ে গিয়েছে। এমন কোনো পথ নেই যেটাতে শয়তানের প্রবেশদ্বার নেই। এমনকি মুসলিমরাও দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। হালাল অন্বেষণ ও হারাম থেকে বেঁচে থাকতে গিয়ে তারা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া-তায়ালা মুত্তাকীদের হিসাব গ্রহণকারী, তিনি তার সমস্ত মুমিন বান্দার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহর আনুগত্য করার প্রতি তাদের ভালোবাসা ও তাঁর অবাধ্যতা করার প্রতি তাদের ঘৃণা তিনি দেখেন। তিনি চাইলে তাদেরকে ক্ষমা, উপেক্ষা, সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ দিয়ে প্রতিদান দিবেন।

ইসলামী শরীয়তে বৈধ ক্রয়-বিক্রয় ও ভাড়ার নিয়মনীতির মাঝে অন্যতম হলো: এটা এমন কিছু হবে যার মাধ্যমে আল্লাহর অবাধ্যতা করা হয় না। সুতরাং অবাধ্যতার সাহায্যকারী হতে পারবে না এবং হারামের দিকে নিয়ে যায় এমন কিছু হতে পারবে না। শরীয়ত যখন কোনো কিছু হারাম করে, তখন সেটার দিকে ধাবিত করে কিংবা সেটা করতে সাহায্য করে এমন সব কিছু শরীয়ত হারাম করে এবং সেটার অভিমুখে পৌঁছে দেয় এমন সকল রাস্তা বন্ধ করার নির্দেশ দেয়।

মহান আল্লাহ বলেন: “নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।” (সূরা মায়েদা: ২)।

শাইখ আব্দুর রহমান আস-সাদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “সকল পাপ ও যুলুম থেকে বান্দাকে বেঁচে থাকতে হবে। অন্যকেও তা ত্যাগে সাহায্য করতে হবে।” [সমাপ্ত] [তাফসীরুস সাদী (পৃ. ২১৮)]।

আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা (৩/১৪০)-তে এসেছে: “অধিকাংশ ফকীহের মতে মদ তৈরি করবে এমন মানুষের কাছে আঙুর বিক্রি করা, জুয়া খেলে এমন মানুষের কাছে জুয়ার উপাদান বিক্রি করা, গীর্জা তৈরির জন্য ঘর বিক্রি করা, ক্রুশ তৈরি করবে এমন ব্যক্তির কাছে কাঠ বিক্রি করা, গীর্জার ঘণ্টা তৈরি করবে এমন ব্যক্তির কাছে তামা বিক্রি করা¾ সঠিক নয়। অনুরূপ বিষয় এমন প্রতিটি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যেখানে ক্রেতা না-জায়েয কিছুর উদ্দেশ্য করবে।” [সমাপ্ত]

বিক্রেতা বা ডিজাইনার বা উৎপাদনকারী যদি নিশ্চিত হয় যে তার প্রস্তুতকৃত জিনিস হারামে ব্যবহৃত হবে, তাহলে সেটা বিক্রি কিংবা উৎপাদন করা জায়েয হবে না। অনুরূপভাবে যদি নিশ্চিত না হলেও তার প্রবল ধারণা হয়, তবু একই হুকুম প্রযোজ্য হবে।

আর যদি বিষয়টিতে সন্দেহ করে কিংবা সে যা বিক্রি ও উৎপাদন করে, তার পরিণতি সম্পর্কে কিছু না জানে, তাহলে বিক্রি বা ডিজাইন করতে সমস্যা নেই। হারামে যিনি ব্যবহার করবেন, গুনাহ তার হবে।

ইবনে হাযম রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “যে বিষয়ে বা যেটার মাধ্যমে আল্লাহর অবাধ্যতা করা হবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সেটা বিক্রি করা বৈধ হবে না। সর্বদা এমন বিক্রি সর্বদাই বাতিল। যেমন: যে সকল বস্তু থেকে জুস তৈরী করা যায় সেগুলো এমন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা যে এটা দিয়ে মদ তৈরি করবে এমনটা নিশ্চিত অথবা এমন ব্যক্তির কাছে দাস বিক্রি করা যে দাসের সাথে দুর্ব্যবহার করার বিষয়টা নিশ্চিত অথবা অস্ত্র ও ঘোড়া এমন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা যে মুসলিমদের উপর আক্রমণ করবে এমনটা নিশ্চিত অথবা এমন ব্যক্তির কাছে রেশমের পোশাক বিক্রি করা যে সেটা পরবে এমনটা নিশ্চিত, এভাবে সব বস্তুর ক্ষেত্রেই। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেন: “নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না।”

আমরা যে সকল বিক্রির কথা উল্লেখ করলাম, সেগুলোর বিস্তারিত আলাপে না গিয়েই বলা যায়, এগুলো সুস্পষ্টভাবে পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সাহায্য করা বলে গণ্য। আর এই ক্রয়-বিক্রয় বাতিল করা নেককাজ ও তাকওয়ায় সাহায্য করার মাঝে গণ্য।

আর যদি এমন কোনো বিষয়ে ব্যক্তি নিশ্চিত না হয়, তাহলে বিক্রয় সঠিক। কারণ সে পাপে সাহায্য করেনি। ক্রেতা পরবর্তীতে আল্লাহর অবাধ্যতা করলে পাপ তার উপর  বর্তাবে (অর্থাৎ শুধু ক্রেতার পাপ হবে, বিক্রেতার নয়)।” [সমাপ্ত] [আল-মুহাল্লা (৭/৫২২)]।

প্রশ্নকর্তা ভাই, আপনার ক্ষেত্রে বিধান একই হবে:

যে ব্যক্তি আপনার কাছে আসল এবং আপনার কাছে এমন ওয়েবসাইটের ডিজাইন চাইল যেটাকে সে হারামে ব্যবহার করবে বলে আপনি জানেন; যেমন: সুদী ব্যাংক কিংবা খোলামেলা ছবি, হারাম পণ্য যেমন মদ, শূকর ও সিগারেট বিক্রি কিংবা সিনেমা ও গানের ওয়েবসাইট, তাহলে আপনার জন্য তার ওয়েবসাইট ডিজাইন করা জায়েয হবে না। সে যে পাপ কাজ করতে চাচ্ছে, সেটাতে সাহায্য করা আপনার জন্য বৈধ হবে না। বরং আপনার কর্তব্য হল তাকে উপদেশ দেওয়া, সুপথ দেখানো এবং আল্লাহভীতি অবলম্বনের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া।

আর যদি আপনি ওয়েবসাইট ডিজাইন চাওয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু না জানেন কিংবা অধিকাংশ সময়ে ওয়েবসাইট উপকারী কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে, তাহলে ওয়েবসাইট ডিজাইন এবং বিক্রি করতে কোনো সমস্যা নেই; যদিও ক্রেতা সেটাকে কিছু হারামের সাথে মিশ্রিত করে। কারণ শরয়ী বিধান সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে, স্বল্প ও বিরলের উপর নয়।

আর আপনার ডিজাইনকৃত ওয়েবসাইটে শিশুর ছবি ঢুকানো জায়েয হবে না। ইতঃপূর্বে আমরা ছবি তোলা হারাম হওয়ার কথা বর্ণনা করেছি। হোক সেটা হাত দিয়ে আঁকা কিংবা যন্ত্র (ফটোগ্রাফিক ক্যামেরা) দিয়ে তোলা। এই হারাম থেকে শুধু প্রয়োজন বা জরুরতের কারণে ছাড় দেওয়া হবে। যেমন: পাসপোর্টের ছবিসহ আরো যে সকল ক্ষেত্রে ছবি প্রয়োজন হয়।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র

অর্থের বিনিময়ে সেবা
হারাম লেনদেন

সূত্র: 

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

Previous
পরবর্তী
at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android