বৃহস্পতিবার 22 যুলক্বদ 1445 - 30 মে 2024
বাংলা

ডিসকাউন্ট কার্ডের হুকুম

প্রশ্ন

কুয়েতে ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের মাঝে কিছু ডিসকাউন্ট কার্ড বিলি করা হয়। ডিসকাউন্টের পরিমাণ ৫% থেকে ২৫% পর্যন্ত। অনেক জায়গা থেকে এই ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়; যেমন অনেক রেস্টুরেন্ট, পোশাকের দোকান, বুকস্টোর ইত্যাদি। কিন্তু লক্ষণীয় হলো: এই ডিসকাউন্ট পেতে হলে ৫ দিনার দিয়ে একটি কার্ড ক্রয় করতে হয়। কেউ কেউ বলেন: এই মূল্যটি বিজ্ঞাপন বা কার্ড বিলিকারী কোম্পানির খরচ হিসেবে তারা নেয়। এই কার্ড ক্রয় করা ও এটি ব্যবহার করা কি জায়েয?

উত্তর

আলহামদু লিল্লাহ।.

এ্যাডভারটাইজিং ও মার্কেটিং কোম্পানিগুলো কিংবা ট্রাভেলস এ্যান্ড টুর্‌স কোম্পানিগুলো কিংবা কিছু ট্রেড সেন্টার যে ডিসকাউন্ট কার্ড ইস্যু করে থাকে এবং কার্ডধারীকে বিভিন্ন পণ্য ও সার্ভিসের উপর কিছু কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট অংকের মূল্যছাড় দিয়ে থাকে; এই কার্ডগুলো দুই ধরণের:

এক. যে কার্ডগুলো আর্থিক মূল্যের বিনিময়ে বাৎসরিক গ্রাহক হওয়ার মাধ্যমে পাওয়া যায়।

দুই. ফ্রি কার্ড। এগুলো সংশ্লিষ্ট সেন্টার বা প্রতিষ্ঠান তাদের সাথে লেনদেনে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ক্রেতাদেরকে উপহার হিসেবে দিয়ে থাকে। কখনও কখনও ক্রেতার কেনাকাটা নির্দিষ্ট একটা সীমাতে পৌঁছলে তাকে কার্ডটি দেয়া হয়।

যে কার্ডগুলো অর্থের বিনিময়ে পাওয়া যায় সেগুলো হারাম। যেহেতু এর মধ্যে নিম্নোক্ত শরয়ি লঙ্ঘন রয়েছে:

১। অস্পষ্টতা ও ধোঁকা। কেননা ক্রেতা ডিসকাউন্ট পাওয়ার জন্য কার্ডের মূল্য হিসেবে নির্দিষ্ট অংকের অর্থ প্রদান করেন। কিন্তু এই ডিসকাউন্টের স্বরূপ ও পরিমাণ অজ্ঞাত। হতে পারে সেই ব্যক্তি এই কার্ডটি ব্যবহারই করবে না। হতে পারে কার্ডটি ব্যবহার করে সে যে পরিমাণ পরিশোধ করেছিল তার চেয়ে কম পাবে কিংবা বেশি পাবে। অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধোঁকানির্ভর ক্রয়বিক্রয় থেকে নিষেধ করেছেন।[সহিহ মুসলিম (১৫১৩)]

ধোঁকানির্ভর ক্রয়বিক্রয় হলো যাতে অজ্ঞতা রয়েছে।

২। এই লেনদেনটি ঝুঁকির উপর প্রতিষ্ঠিত এবং লাভ ও লোকসানের মধ্যে ঘূর্ণয়মান। ক্রেতা কার্ডটি পাওয়ার জন্য যে মূল্য পরিশোধ করে এর মাধ্যমে সে ঝুঁকি নেয়। হয়তো সে লাভবান হবে; যদি সে যত পরিশোধ করেছে এর চেয়ে বেশি ডিসকাউন্ট পায়। নয়তো সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে; যদি সে যত পরিশোধ করেছে এর চেয়ে কম ডিসকাউন্ট পায়। এটাই হলো শরিয়তে নিষিদ্ধ জুয়ার স্বরূপ। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিগুলো ও ভাগ্য নির্ণয়ের পাত্রগুলোনোংরা, শয়তানী কর্ম ছাড়া আর কিছু নয়। অতএব এসব থেকে দূরে থাক; যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।[সূরা মায়িদা, আয়াত: ৯০]

৩। এই কার্ডগুলোর মাধ্যমে মানুষকে ধোঁকা দেয়া হয় এবং তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া হয়। প্রতিশ্রুত এসব ডিসকাউন্টের অধিকাংশ কাল্পনিক ও অবাস্তব।

এসব দোকানগুলোর অনেক মালিক নিজেই দাম বাড়ায়। এরপর কার্ডধারীদেরকে দেখায় যে, তারা মূল্য ছাড় দিয়েছে। প্রকৃত অবস্থা হলো তারা ততটুকু মূল্য কমায় যতটুকু তারা অন্য দোকানগুলো থেকে বাড়িয়েছিল।

৪। এই কার্ডগুলো অনেক সময় ঝগড়া বিবাদের কারণে পরিণত হয়। কারণ যে প্রতিষ্ঠান এই কার্ডটি ইস্যু করেছে সে প্রতিষ্ঠান সকল ট্রেড সেন্টার, কোম্পানি ও ইস্টাবলিশমেন্টকে চুক্তিকৃত পার্সেন্টিজে মূল্যছাড় দিতে বাধ্য করতে পারে না। যার ফলে বিষয়টি ঝগড়াঝাটির দিকে গড়ায়।

যা কিছু মতভেদ ও ঝগড়াঝাটির কারণ তা রোধ করা আবশ্যকীয়। যেমনটি আল্লাহ্‌ তাআলা বলেছেন: বস্তুত মদ ও জুয়ার মাধ্যমে শয়তান চায় তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহ্‌র স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখতে। অতএব তোমরা কি (এসব) ছাড়বে?[সূরা মায়িদা, ৫:৯১]

৫। এ ধরনের ডিসকাউন্ট কার্ডে অন্য ব্যবসায়ীদের ক্ষতি করা হয়; যারা এই ডিসকাউন্ট প্রোগ্রামে যোগদান করেনি।

এ ধরণের কার্ডের সয়লাবের ফলে এই ডিসকাউন্ট প্রোগ্রামে অংশগ্রহণকারী দোকানদার ও অংশগ্রহণ না-কারী দোকানদারদের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ তৈরী হয়। যেহেতু ডিসকাউন্টদাতা দোকানগুলোর পণ্য বিক্রি হয়ে যায়; আর যে দোকানদারেরা ডিসকাউন্ট প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেনি তাদের পণ্য বিক্রি হয় না।[ফাতাওয়াল লাজনাদ দায়িমা (১০১৪)]

৬। ডিসকাউন্ট কার্ডের গ্রাহক কার্ডের যে ফিস পরিশোধ করে প্রকৃতপক্ষ এর কোন বিনিময় নেই। সে যদি দোকানদারকে মূল্য কমাতে বলে হতে পারে সে কার্ডধারীদেরকে দেয়া প্রতিশ্রুত মূল্যছাড় পাবে কিংবা এর কাছাকাছি মূল্যছাড় পাবে। তখন সে যে অর্থটি কার্ডের মুল্য হিসেবে পরিশোধ করেছে এর কোন আর বিনিময় থাকে না। এটাই হলো অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ। কুরআনের দলিলের ভিত্তিতে এটি নিষিদ্ধ: হে ঈমানদারেরা তোমরা তোমাদের সম্পদ নিজেদের মধ্যে অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।

রাবেতা আলমে ইসলামীর অধিভুক্ত ‘ফিকাহ একাডেমী’–র ১৮ তম অধিবেশনে এই কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন করা হারাম হওয়ার পক্ষে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে সিদ্ধান্তের ভাষ্য হলো: এ বিষয়ে উত্থাপিত গবেষণাগুলো ও সেগুলোর ওপর আলোচনা-পর্যালোচনা শুনার পর সিদ্ধান্ত হলো: উল্লেখিত ডিসকাউন্ট কার্ড ইস্যু করা কিংবা ক্রয় করা নাজায়েয; যদি এককালীন মূল্য দিয়ে কিংবা বাৎসরিক মূল্য দিয়ে সেগুলো কিনতে হয়। যেহেতু এতে ধোঁকা রয়েছে। কেননা কার্ড ক্রয়কারী অর্থ পরিশোধ করে; অথচ সে জানে না যে, এর বিপরীতে সে কী পাবে। তাই এক্ষেত্রে লোকসান হওয়া সুনিশ্চিত। আর লাভ হওয়া সম্ভাবনাময়।

অনুরূপভাবে স্থায়ী কমিটি থেকে এই ডিসকাউন্ট শ্রেণীর কার্ড দিয়ে লেনদেন করা হারাম হওয়া মর্মে ফতোয়া ইস্যু হয়েছে। এবং শাইখ বিন বায ও শাইখ উছাইমীনও এই ফতোয়া দেন।

[দেখুন: ফাতাওয়াল লাজনাদ দায়িমা (৬/১৪), ফাতাওয়া বিন বায (১৯/৫৮)]

আর ফ্রি কার্ডগুলো; যেগুলো বিনামূল্যে ক্রেতাকে প্রদান করা হয় সেগুলো ব্যবহার করতে ও সেগুলোর মাধ্যমে উপকৃত হতে কোন বাধা নাই। কেননা কার্ডটি ফ্রি দেয়া হলে সেটি লেনদেনকে অনুদান শ্রেণীর চুক্তিতে পরিণত করে। অনুদান শ্রেণীর চুক্তিতে অস্পষ্টতা ক্ষমার্হ।

সারকথা হলো: ফ্রিতে পাওয়া কার্ড থেকে যদি ক্রেতা কোন ডিসকাউন্ট না পায় তাহলেও তার কোন লোকসান নেই।

এই মর্মে ফিকাহ একাডেমীর সিদ্ধান্ত রয়েছে। তাতে আছে: যদি ডিসকাউন্ট কার্ডগুলো বিনামূল্যে ফ্রি ইস্যু করা হয়; তাহলে সেগুলো ইস্যু করা ও গ্রহণ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েয। যেহেতু তখন সেটি অনুদানের কিংবা উপহারের প্রতিশ্রুতি শ্রেণীয়।

আরও জানতে পড়ুন:

শাইখ বাকর আবু যায়েদ লিখিত: بطاقة التخفيض حقيقتها التجارية وأحكامها الشرعية

এবং ড. খালিদ আল-মুসলিহ রচিত: الحوافز التجارية التسويقية وأحكامها في الفقه الإسلامي

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব